পরিচয় জানা নেই
আফরোজা জামান ( মুন্নী )
নিবেদিতা একটি আইটি অফিসে চাকরী করে। আজ অফিসে একটু বেশী কাজের চাপ ছিল। অফিস থেকে বাসায় ফেরার পরে শরীরটা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে। ধকল সামাল দিতে হয়তো কিছুটা সময় লেগে যাবে, এই আর কি...... বাইরের কাপড় না ছেড়েই আজ নিবেদিতা বিছানায় শুয়ে পড়েছে। ওর মা বলল, চা খেলে ক্লান্তিটা কেটে যাবে, আমি চা করে দিচ্ছি। আজ নিবেদিতার মেজ বোন বাড্ডা থেকে বেড়াতে এসেছে স্বপরিবারে। ওর দুষ্ট একটা ছেলে আছে। নিবেদিতা ওকে ছোটন মনি বলে ডাকে। এই বাসায় ঐ একটিমাত্র বাচ্চা,বয়স তিন এর মতো হবে। তাই ছোটন যখন বাসায় আসে, সবাই তখন ওকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে। সবার চোখের মনি যে...
এ সময়ে হঠাৎ দরজায় কড়া নড়ে উঠল। এখনতো তো কারও আসার কথা নয়। কে আসলো..? বিরক্তি নিয়েই নিবেদিতা শোয়া থেকে উঠে দরজা খুলতে গেলো। দরজা খোলা মাত্র দেখতে পেলো অচেনা একটা ছোট ছেলের মায়াবী মুখ। চোখে ক্লান্তি ভাব,নির্বাক দৃষ্টিতে নিবেদিতার দিকে তাকিয়ে আছে।
বলল : আমারে কিছু খাইতে দিবেন আন্টি ? আমি হারাদিনে কিচ্ছুু খাইনাই। ছেলেটির মুখও ভিষন শুকনো ছিল। মিথ্যে বলছে বলে মনে হলো না। মিথ্যে হলে এত কষ্ট করে নিশ্চয়ই ছয় তলাতে উঠতো না। এর মধ্যে পিছনে নিবেদিতার মা এসে ছেলেটির কথা শুন ফেললেন। তিনি বললেন : দুপুরের ভাত আছে, ভিতরে আয়।
ছেলেটিকে নিবেদিতা বললো : “এসো”। ড্রইং রুমে নিবেদিতাকে লক্ষ্য করে ছেলেটি ঢুকলো। ছোটন গাড়ি নিয়ে খেলছিলো। কোন জড়তা ছাড়াই ছেলেটি ছোটনের পাশে বসে ওর খেলা দেখতে লাগলো। কত হবে ছেলেটির বয়স, ছয় কি সাত।
নিবেদিতা ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলো : কি নাম তোমার ?
শাহাজাদা।
বা সুন্দর নাম। তুমি কোথায় থাক ?
অহন কোথ্থাও থাহিনা....
মানে......?
নিকুঞ্জত্ এক বাসাত্ থাইকতাম। কাপ,পিরিচ,গেলাস মুইছপার কইছিলো। একটা গেলাস হাত থোন পরি ভাঙ্গি গেছে, ডিনার সেটের গেলাস ভাঙ্গিছে বলি..হামাগ মাইরলো। হামাগ বার করি দিলো।
নিবেদিতা জানতে চাইলো....তোমার মা-বাবা কোথায় থাকে ?
শাহাজাদা বললো : আব্বায় তো মেলাদিন অইছে মরি গেছে। তহন হামরা গেরামে থাইকতাম। মায় হামাগ নিয়া ঐ পাড়ে জামতলা বস্তিত্ থাইকতো,মানুষের বাসায় কাম কইরতো। আমারে বেরাকের একটা ইসকুলে ভর্তিও করি দিছিলো।
নিবেদিতা বললো : তাহলে লেখাপড়া রেখে তুমি কাজ করছো কেন...? তোমার মা তোমাকে কাজে দিলো!
হামার মা তো গত শুক্কুরবারে টেরেনে কাটা পরি মরি গেছে।
নিবেদিতা হতবাক দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছে, কী বলছে, ছেলেটি। ছোটন স্প্রিং এর গাড়ি ধাক্কা দিয়ে চালাচ্ছিলো। গাড়িটি যেখানে যেয়ে থামে, সেখানে যেয়ে আবারও ধাক্কা দিচ্ছিলো। শাহাজাদার খেয়াল সেই গাড়ির দিকে। মুখে কথার জবাব দিচ্ছিলো ঠিক। তবে চেহারাটা খুব মলিন, কথা বলতেও ওর কষ্ট হচ্ছিলো। শাহাজাদা এমনভাবে উত্তর দিলো, ট্রেনে কাটা পরে ওর মা মারা গেছে এটা যেন কোন ব্যপারই নয়।
এর মধ্যে নিবেদিতার মা ওর জন্য ভাত নিয়ে আসলো। ছেলেটি সত্যিই অনেক ক্ষুধার্ত ছিল। কোনো দিকে না তাকিয়ে ওর মনে ও খেতে থাকলো। নিবেদিতা ছেলেটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভালো কোন তরকারী নয়, অথচ ছেলেটা এত মজা করে খাচ্ছে।
মমতাজ বেগম জানতে চাইলেন : কোন জায়গায় ট্রেনে কাটা পড়ছে তোর মা..?
শাহাজাদা বললো : বাজারের কাছে।
নিবেদিতার মা বললেন : হ্যা..আমিও শুনছি, ক’দিন আগে একজন মহিলা ট্রেনে কাটা পরে মারা গেছে। তুই তখন কই ছিলি...?
হামি মার কাছেই ছিলাম। খেতে খেতে শাহাজাদা নিবেদিতার মায়ের কথার উত্তর দিলো।
নিবেদিতা বললো : তুমি সাথেই ছিলা। তুমি এ্যাকসিডেন্ট দেখেছো ?
শাহাজাদা হা-সূচক মাথা নাড়ল।
নিবেদিতার মনে হলো, ও বোধ হয় আর নিজের মধ্যে নেই। এতটুকু একটা বাচ্চা ছেলে, চোখের সামনে নিজের মাকে ট্রেনে কাটা পরে মারা যেতে দেখেছে। কি নিষ্ঠুর বিধির খেলা.....।
পৃথিবীতে অনেক মানুষের কত টাকা। আবার কেউ পথের ভিখিরী। আবার অনেক ধনী বা মধ্যবৃত্ত পরিবার আছে, একটা সন্তানের জন্য হাহাকার করে মরছে। আল্লাহ্ একটা সন্তান দিচ্ছেনা। আবার এমনো গরীব পরিবার আছে, যারা সন্তানদের টিকমতো খেতেও দিতে পারে না। ঠিকমতো দেখাশুনাও করতে পারে না। তারপরেও তাকে আল্লাহ কয়েকটা সন্তান দিয়ে রেখেছে। এই যে, শাহাজাদা.....আজ পিতৃ-মাতৃহীন। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। দু-বেলা দু-মুঠো ওর মুখে খাবার জুটিয়ে দেবার মতো কেউ নেই। কিন্তু......এরই নাম নিয়তি।
খাওয়া শেষেও শাহাজাদার খেয়াল ছোটনের গাড়ির দিকে। নিবেদিতা বললো....যাও ওর সাথে কিছুক্ষণ খেলা করো। ছেলেটি সত্যিই খেলায় মগ্ন হয়ে গেল।
নিবেদিতা জিজ্ঞেস করলো...তাহলে আজ রাতে কোথায় থাকবা তুমি...? ছেলেটি মুখটা খানিকটা বাকা করলো... যার উত্তর হলো, যে ও কিছুই জানেনা।
যার মাথার উপর কোন ছাদ নেই...সে কি নিশ্চিন্ত মনে খেলছে। এখন ও জানে না, একটু পরে ওর কী হবে...? কোথায় থাকবে..? কে ওকে খেতে দিবে....? কাল সকালে ওর কী হবে..? পুরোটাই অনিশ্চয়তা। নিবেদিতা অফিসের কøান্তিবোধ, সেটাতো ছেলেটার কথা শুনতে শুনতে কখন পালিয়ে গেছে, তা ভাবার অবকাশ এখন আর ওর মাঝে নেই।
নিবেদিতা শাহাজাদাকে জিজ্ঞেস করলো : ঢাকায় তোমার কেউ থাকে না।
না......সে নিবেদিতার দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলো।
মমতাজ বেগম জিজ্ঞেস করলো : দেশে কেউ নেই তোর ?
হামার গেরামের বাড়িতো হামি চিনিনা। মায় বইলেছে, ছিটমহল।
ঠিক তাইতো, এতটুকুু একটা ছেলের গ্রামের বাড়ি চিনে,ফিরে যেতে পারার কথা নয়। তার মানে ছিটমহলের ছেলে। যেখানে বাংলাদেশ এবং ভারত দুই দেশের বাসিন্দারা থাকে। সবধরনের সুযোগ থেকে যারা বঞ্চিত। ভারত বা বাংলাদেশ কোন দেশেরই সুযোগ ভোগ করতে পারে না ওরা। তবুও ওরা মানুষ, কেবলই মানুষ। এটাই ওদের একমাত্র পরিচয়। আর শাহাজাদা----রাজার একমাত্র ছেলে, বাবা-মা নেই, আত্মীয় স্বজন থেকেও নেই। রাজ্যও নেই, রাজত্বও নেই, তবু ও শাহাজাদা। বাবা-মা হয়তো শখ করে শাহাজাদা নাম রেখেছিলো। নামটুকু বহনকরা ছাড়া ওর কোন পরিচয়ই ওর জানা নেই। জীবন আসলে কী.....হয়তো ঊর্মিমালায় ডুবে থাকা নোঙ্গর,
নিবেদিতা বললো তুমি আজ রাতটা আমাদের এখানে থাকো। সবাই তাতে সম্মতিও দিলো। কিন্তু নিবেদিতা ভাবছিলো, আজকের রাতটুকু হয়তো এ বাসায় ওর আশ্রয় মিলে গেলো। কিন্তু কাল ও কোথায় থাকবে..কী করবে..? ওর যদি অনেক টাকা থাকতো, তাহলে ঠিক শাহাজাদার দায়িত্ব নিতো। কিন্তু সে ক্ষমতা বিধাতা ওকে দেয়নি, নিজের অজান্তে বুকের মাঝ থেকে দীর্ঘনিঃশ^াস বের হয়ে আসে। শুধু আমরা আহারে...উহুরেই করে যেতে পারবো, কিন্তু সত্যিকার অর্থে ছেলেটির জন্য কিছুই করতে পারবো না। সমাজের যারা করতে পারবে, তারা হয়তো সেভাবে করবেনা বা করেনা। এমন অনেক ধনীর সন্তান আছে, যারা একটি জামার যায়গায় দশটি জামা কিনতে পারে। আর সেখানে সুবিধা বঞ্চিত অনেক শিশু আছে, যাদের একটি জামাতো দূরে থাক, পেটের ক্ষুধা মেটানোর মতো খাবার ও ভাগ্যে জোটেনা। সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হবার পরে বিশ্রামের প্রস্তুতি চলছিলো। নিবেদিতাদের বাসার বাড়িওয়ালাদের একসঙ্গে চারটি বাড়ি। প্রথমে বড় গেট। পরে সবগুলো বিল্ডিং এর আলাদা আলাদা গেট। তিনি নিজেও সমাজের প্রভাবশালী মানুষ। তাই কড়া নজরদারীর মধ্যে থাকতে হয় বাড়ির ভাড়াটিয়া থেকে সবার। এ বাড়িতে নিরাপত্তার কড়া ব্যাবস্থা। রাত প্রায় ১০:০০ টার ও বেশী বেজে গেছে, তখন বাড়ির দাড়োয়ান এসে ওদের দরজায় কড়া নাড়লো।
সে নিবেদিতার মাকে বললো, আপনাদের বাসায় নাকি একটা ছোট শিশু বাচ্চা আসছে।
নিবেদিতার মা সব খুলে বললেন।
নিবেদিতার মাকে তিনি বললেন, আজকাল ছোট শিশু বাচ্চাদের দিয়াও ক্রাইম করানো হয়, দেশের অবস্থাতো ভালো না, জানেনতো। ছেলেটি সম্মন্ধেতো আমরা কেউই কিছু ভালো করে জানিনা। পরে আপনারাও বিপদে পরবেন, আমিও। ওকে বের করে দেন।
নিবেদিতা বললো, ছেলেটি সকালে চলে যাবে। এত রাতে কোথায় যাবে...।
দাড়োয়ানকে দেখেই ও যেমন ভয়ে কুকড়ে আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছে। হয়তো শাহাজাদা বুঝে গিয়েছিলো, ওর এখানের আশ্রয়টুকুও এখনই শেষ হতে চলেছে, দাড়োয়ান ওর দিকে তাকিয়ে বললো, এই তোকে না ঢুকতে নিষেধ করছিলাম, কোন ফাঁকে ঢুকে গেলি তুই। এখনই বিদায় হ, বলতাছি...
নিবেদিতা বললো, কী আশ্চর্য, এতটুকু ছোট ছেলে, ও আবার ক্রাইমের কী বুঝে...? আর এত রাতে ছেলেটিকে অমানুষের মতো আমরা কীভাবে বের করে দিই বলেন আঙ্কেল...।
কিন্তু এই বাড়িতে থাকতে হইলে এই বাড়ির নিয়ম-কানুনতো মাইনা চলতে হইবো, মা। ছেলেটিতো তোমাদের আত্মীয় না, অচেনা কাউকে ঘরে আশ্রয় দিতে পারো না। এ বাড়িতে তো সম্ভবই না। বলেই তিনি হনহন করে নীচে নেমে গেলেন।
উনি চলে যাবার পর শুরু হলো, ছেলেটিকে বের করে দেবার প্রস্তুতি। শাহাজাদার চোখে প্রচন্ড ঘুম,দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো। তবুও যাকে ওরা আশ্রয় দিয়েছে, তাদের কথাতো ওকে শুনতেই হবে। ও যে অসহায়....। শাহাজাদা বারবার নিবেদিতার দিকে তাকাচ্ছিলো। ভাবছিলো, আন্টি বোধ হয় ওকে ফিরাবে। নিবেদিতা তবুও সবাইকে বললো, থাকনা ও আজকের রাতটা, বাড়িওয়ালারা জানবেনা। কিন্তু, কেউ আর সে দায়িত্ব নিতে রাজী হলোনা। নিবেদিতা এখান থেকে সরে গেলো। অসহায় ছেলেটির মুখে কী যে দুঃখী দুঃখী ভাব, নিবেদিতা সৈহ্য করতে পারছিলো না।
অমানুষের মতো সবাই মিলে শাহাজাদাকে বের করে দিলো। সবার মনের কথা নিবেদিতা জানে না। কিন্তু সারারাত ও একটুও ঘুমোতে পারলো না। ওর জন্য চিন্তারা মনের মাঝে ভিড় করছিলো। এত রাতে শাহাজাদা কোথায় যাবে..কোথায় থাকবে...এত রাতে আবার কোথায় আশ্রয় চাইবে।
কিন্তু শাহাজাদাকে মনের চোখ কেন যেন আজও খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু কোথাও ওর দেখা মিলে না। প্রায় পাঁচ বছর আগের কথা। এতদিনে হয়তো আরও বড় হয়েছে। নিবেদিতা শাহাজাদাকে এখন দেখলে হয়তো চিনতেও পারবে না। ছেলেটির জন্য ও সবসময় দোয়া করে, ও যেন ভালো মানুষের হাতে পরে, মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। কী জানি ছেলেটি, এখন কোথায় আছে, কেমন আছে ? কিন্তু সেই ছোট্ট ছেলেটির অসহায় মুখের অভোয়ব আজও ওর মনে মনিকোঠায় দখল নিয়ে রেখেছে। চোখের সামনে ছোট্ট শিশুটির চেহারা ভাসমান কচুরীপানার মতো কেবলই ভাসতে থাকে।
সমাপ্ত
আফরোজা জামান ( মুন্নী )
নিবেদিতা একটি আইটি অফিসে চাকরী করে। আজ অফিসে একটু বেশী কাজের চাপ ছিল। অফিস থেকে বাসায় ফেরার পরে শরীরটা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে। ধকল সামাল দিতে হয়তো কিছুটা সময় লেগে যাবে, এই আর কি...... বাইরের কাপড় না ছেড়েই আজ নিবেদিতা বিছানায় শুয়ে পড়েছে। ওর মা বলল, চা খেলে ক্লান্তিটা কেটে যাবে, আমি চা করে দিচ্ছি। আজ নিবেদিতার মেজ বোন বাড্ডা থেকে বেড়াতে এসেছে স্বপরিবারে। ওর দুষ্ট একটা ছেলে আছে। নিবেদিতা ওকে ছোটন মনি বলে ডাকে। এই বাসায় ঐ একটিমাত্র বাচ্চা,বয়স তিন এর মতো হবে। তাই ছোটন যখন বাসায় আসে, সবাই তখন ওকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে। সবার চোখের মনি যে...
এ সময়ে হঠাৎ দরজায় কড়া নড়ে উঠল। এখনতো তো কারও আসার কথা নয়। কে আসলো..? বিরক্তি নিয়েই নিবেদিতা শোয়া থেকে উঠে দরজা খুলতে গেলো। দরজা খোলা মাত্র দেখতে পেলো অচেনা একটা ছোট ছেলের মায়াবী মুখ। চোখে ক্লান্তি ভাব,নির্বাক দৃষ্টিতে নিবেদিতার দিকে তাকিয়ে আছে।
বলল : আমারে কিছু খাইতে দিবেন আন্টি ? আমি হারাদিনে কিচ্ছুু খাইনাই। ছেলেটির মুখও ভিষন শুকনো ছিল। মিথ্যে বলছে বলে মনে হলো না। মিথ্যে হলে এত কষ্ট করে নিশ্চয়ই ছয় তলাতে উঠতো না। এর মধ্যে পিছনে নিবেদিতার মা এসে ছেলেটির কথা শুন ফেললেন। তিনি বললেন : দুপুরের ভাত আছে, ভিতরে আয়।
ছেলেটিকে নিবেদিতা বললো : “এসো”। ড্রইং রুমে নিবেদিতাকে লক্ষ্য করে ছেলেটি ঢুকলো। ছোটন গাড়ি নিয়ে খেলছিলো। কোন জড়তা ছাড়াই ছেলেটি ছোটনের পাশে বসে ওর খেলা দেখতে লাগলো। কত হবে ছেলেটির বয়স, ছয় কি সাত।
নিবেদিতা ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলো : কি নাম তোমার ?
শাহাজাদা।
বা সুন্দর নাম। তুমি কোথায় থাক ?
অহন কোথ্থাও থাহিনা....
মানে......?
নিকুঞ্জত্ এক বাসাত্ থাইকতাম। কাপ,পিরিচ,গেলাস মুইছপার কইছিলো। একটা গেলাস হাত থোন পরি ভাঙ্গি গেছে, ডিনার সেটের গেলাস ভাঙ্গিছে বলি..হামাগ মাইরলো। হামাগ বার করি দিলো।
নিবেদিতা জানতে চাইলো....তোমার মা-বাবা কোথায় থাকে ?
শাহাজাদা বললো : আব্বায় তো মেলাদিন অইছে মরি গেছে। তহন হামরা গেরামে থাইকতাম। মায় হামাগ নিয়া ঐ পাড়ে জামতলা বস্তিত্ থাইকতো,মানুষের বাসায় কাম কইরতো। আমারে বেরাকের একটা ইসকুলে ভর্তিও করি দিছিলো।
নিবেদিতা বললো : তাহলে লেখাপড়া রেখে তুমি কাজ করছো কেন...? তোমার মা তোমাকে কাজে দিলো!
হামার মা তো গত শুক্কুরবারে টেরেনে কাটা পরি মরি গেছে।
নিবেদিতা হতবাক দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছে, কী বলছে, ছেলেটি। ছোটন স্প্রিং এর গাড়ি ধাক্কা দিয়ে চালাচ্ছিলো। গাড়িটি যেখানে যেয়ে থামে, সেখানে যেয়ে আবারও ধাক্কা দিচ্ছিলো। শাহাজাদার খেয়াল সেই গাড়ির দিকে। মুখে কথার জবাব দিচ্ছিলো ঠিক। তবে চেহারাটা খুব মলিন, কথা বলতেও ওর কষ্ট হচ্ছিলো। শাহাজাদা এমনভাবে উত্তর দিলো, ট্রেনে কাটা পরে ওর মা মারা গেছে এটা যেন কোন ব্যপারই নয়।
এর মধ্যে নিবেদিতার মা ওর জন্য ভাত নিয়ে আসলো। ছেলেটি সত্যিই অনেক ক্ষুধার্ত ছিল। কোনো দিকে না তাকিয়ে ওর মনে ও খেতে থাকলো। নিবেদিতা ছেলেটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভালো কোন তরকারী নয়, অথচ ছেলেটা এত মজা করে খাচ্ছে।
মমতাজ বেগম জানতে চাইলেন : কোন জায়গায় ট্রেনে কাটা পড়ছে তোর মা..?
শাহাজাদা বললো : বাজারের কাছে।
নিবেদিতার মা বললেন : হ্যা..আমিও শুনছি, ক’দিন আগে একজন মহিলা ট্রেনে কাটা পরে মারা গেছে। তুই তখন কই ছিলি...?
হামি মার কাছেই ছিলাম। খেতে খেতে শাহাজাদা নিবেদিতার মায়ের কথার উত্তর দিলো।
নিবেদিতা বললো : তুমি সাথেই ছিলা। তুমি এ্যাকসিডেন্ট দেখেছো ?
শাহাজাদা হা-সূচক মাথা নাড়ল।
নিবেদিতার মনে হলো, ও বোধ হয় আর নিজের মধ্যে নেই। এতটুকু একটা বাচ্চা ছেলে, চোখের সামনে নিজের মাকে ট্রেনে কাটা পরে মারা যেতে দেখেছে। কি নিষ্ঠুর বিধির খেলা.....।
পৃথিবীতে অনেক মানুষের কত টাকা। আবার কেউ পথের ভিখিরী। আবার অনেক ধনী বা মধ্যবৃত্ত পরিবার আছে, একটা সন্তানের জন্য হাহাকার করে মরছে। আল্লাহ্ একটা সন্তান দিচ্ছেনা। আবার এমনো গরীব পরিবার আছে, যারা সন্তানদের টিকমতো খেতেও দিতে পারে না। ঠিকমতো দেখাশুনাও করতে পারে না। তারপরেও তাকে আল্লাহ কয়েকটা সন্তান দিয়ে রেখেছে। এই যে, শাহাজাদা.....আজ পিতৃ-মাতৃহীন। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। দু-বেলা দু-মুঠো ওর মুখে খাবার জুটিয়ে দেবার মতো কেউ নেই। কিন্তু......এরই নাম নিয়তি।
খাওয়া শেষেও শাহাজাদার খেয়াল ছোটনের গাড়ির দিকে। নিবেদিতা বললো....যাও ওর সাথে কিছুক্ষণ খেলা করো। ছেলেটি সত্যিই খেলায় মগ্ন হয়ে গেল।
নিবেদিতা জিজ্ঞেস করলো...তাহলে আজ রাতে কোথায় থাকবা তুমি...? ছেলেটি মুখটা খানিকটা বাকা করলো... যার উত্তর হলো, যে ও কিছুই জানেনা।
যার মাথার উপর কোন ছাদ নেই...সে কি নিশ্চিন্ত মনে খেলছে। এখন ও জানে না, একটু পরে ওর কী হবে...? কোথায় থাকবে..? কে ওকে খেতে দিবে....? কাল সকালে ওর কী হবে..? পুরোটাই অনিশ্চয়তা। নিবেদিতা অফিসের কøান্তিবোধ, সেটাতো ছেলেটার কথা শুনতে শুনতে কখন পালিয়ে গেছে, তা ভাবার অবকাশ এখন আর ওর মাঝে নেই।
নিবেদিতা শাহাজাদাকে জিজ্ঞেস করলো : ঢাকায় তোমার কেউ থাকে না।
না......সে নিবেদিতার দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলো।
মমতাজ বেগম জিজ্ঞেস করলো : দেশে কেউ নেই তোর ?
হামার গেরামের বাড়িতো হামি চিনিনা। মায় বইলেছে, ছিটমহল।
ঠিক তাইতো, এতটুকুু একটা ছেলের গ্রামের বাড়ি চিনে,ফিরে যেতে পারার কথা নয়। তার মানে ছিটমহলের ছেলে। যেখানে বাংলাদেশ এবং ভারত দুই দেশের বাসিন্দারা থাকে। সবধরনের সুযোগ থেকে যারা বঞ্চিত। ভারত বা বাংলাদেশ কোন দেশেরই সুযোগ ভোগ করতে পারে না ওরা। তবুও ওরা মানুষ, কেবলই মানুষ। এটাই ওদের একমাত্র পরিচয়। আর শাহাজাদা----রাজার একমাত্র ছেলে, বাবা-মা নেই, আত্মীয় স্বজন থেকেও নেই। রাজ্যও নেই, রাজত্বও নেই, তবু ও শাহাজাদা। বাবা-মা হয়তো শখ করে শাহাজাদা নাম রেখেছিলো। নামটুকু বহনকরা ছাড়া ওর কোন পরিচয়ই ওর জানা নেই। জীবন আসলে কী.....হয়তো ঊর্মিমালায় ডুবে থাকা নোঙ্গর,
নিবেদিতা বললো তুমি আজ রাতটা আমাদের এখানে থাকো। সবাই তাতে সম্মতিও দিলো। কিন্তু নিবেদিতা ভাবছিলো, আজকের রাতটুকু হয়তো এ বাসায় ওর আশ্রয় মিলে গেলো। কিন্তু কাল ও কোথায় থাকবে..কী করবে..? ওর যদি অনেক টাকা থাকতো, তাহলে ঠিক শাহাজাদার দায়িত্ব নিতো। কিন্তু সে ক্ষমতা বিধাতা ওকে দেয়নি, নিজের অজান্তে বুকের মাঝ থেকে দীর্ঘনিঃশ^াস বের হয়ে আসে। শুধু আমরা আহারে...উহুরেই করে যেতে পারবো, কিন্তু সত্যিকার অর্থে ছেলেটির জন্য কিছুই করতে পারবো না। সমাজের যারা করতে পারবে, তারা হয়তো সেভাবে করবেনা বা করেনা। এমন অনেক ধনীর সন্তান আছে, যারা একটি জামার যায়গায় দশটি জামা কিনতে পারে। আর সেখানে সুবিধা বঞ্চিত অনেক শিশু আছে, যাদের একটি জামাতো দূরে থাক, পেটের ক্ষুধা মেটানোর মতো খাবার ও ভাগ্যে জোটেনা। সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হবার পরে বিশ্রামের প্রস্তুতি চলছিলো। নিবেদিতাদের বাসার বাড়িওয়ালাদের একসঙ্গে চারটি বাড়ি। প্রথমে বড় গেট। পরে সবগুলো বিল্ডিং এর আলাদা আলাদা গেট। তিনি নিজেও সমাজের প্রভাবশালী মানুষ। তাই কড়া নজরদারীর মধ্যে থাকতে হয় বাড়ির ভাড়াটিয়া থেকে সবার। এ বাড়িতে নিরাপত্তার কড়া ব্যাবস্থা। রাত প্রায় ১০:০০ টার ও বেশী বেজে গেছে, তখন বাড়ির দাড়োয়ান এসে ওদের দরজায় কড়া নাড়লো।
সে নিবেদিতার মাকে বললো, আপনাদের বাসায় নাকি একটা ছোট শিশু বাচ্চা আসছে।
নিবেদিতার মা সব খুলে বললেন।
নিবেদিতার মাকে তিনি বললেন, আজকাল ছোট শিশু বাচ্চাদের দিয়াও ক্রাইম করানো হয়, দেশের অবস্থাতো ভালো না, জানেনতো। ছেলেটি সম্মন্ধেতো আমরা কেউই কিছু ভালো করে জানিনা। পরে আপনারাও বিপদে পরবেন, আমিও। ওকে বের করে দেন।
নিবেদিতা বললো, ছেলেটি সকালে চলে যাবে। এত রাতে কোথায় যাবে...।
দাড়োয়ানকে দেখেই ও যেমন ভয়ে কুকড়ে আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছে। হয়তো শাহাজাদা বুঝে গিয়েছিলো, ওর এখানের আশ্রয়টুকুও এখনই শেষ হতে চলেছে, দাড়োয়ান ওর দিকে তাকিয়ে বললো, এই তোকে না ঢুকতে নিষেধ করছিলাম, কোন ফাঁকে ঢুকে গেলি তুই। এখনই বিদায় হ, বলতাছি...
নিবেদিতা বললো, কী আশ্চর্য, এতটুকু ছোট ছেলে, ও আবার ক্রাইমের কী বুঝে...? আর এত রাতে ছেলেটিকে অমানুষের মতো আমরা কীভাবে বের করে দিই বলেন আঙ্কেল...।
কিন্তু এই বাড়িতে থাকতে হইলে এই বাড়ির নিয়ম-কানুনতো মাইনা চলতে হইবো, মা। ছেলেটিতো তোমাদের আত্মীয় না, অচেনা কাউকে ঘরে আশ্রয় দিতে পারো না। এ বাড়িতে তো সম্ভবই না। বলেই তিনি হনহন করে নীচে নেমে গেলেন।
উনি চলে যাবার পর শুরু হলো, ছেলেটিকে বের করে দেবার প্রস্তুতি। শাহাজাদার চোখে প্রচন্ড ঘুম,দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো। তবুও যাকে ওরা আশ্রয় দিয়েছে, তাদের কথাতো ওকে শুনতেই হবে। ও যে অসহায়....। শাহাজাদা বারবার নিবেদিতার দিকে তাকাচ্ছিলো। ভাবছিলো, আন্টি বোধ হয় ওকে ফিরাবে। নিবেদিতা তবুও সবাইকে বললো, থাকনা ও আজকের রাতটা, বাড়িওয়ালারা জানবেনা। কিন্তু, কেউ আর সে দায়িত্ব নিতে রাজী হলোনা। নিবেদিতা এখান থেকে সরে গেলো। অসহায় ছেলেটির মুখে কী যে দুঃখী দুঃখী ভাব, নিবেদিতা সৈহ্য করতে পারছিলো না।
অমানুষের মতো সবাই মিলে শাহাজাদাকে বের করে দিলো। সবার মনের কথা নিবেদিতা জানে না। কিন্তু সারারাত ও একটুও ঘুমোতে পারলো না। ওর জন্য চিন্তারা মনের মাঝে ভিড় করছিলো। এত রাতে শাহাজাদা কোথায় যাবে..কোথায় থাকবে...এত রাতে আবার কোথায় আশ্রয় চাইবে।
কিন্তু শাহাজাদাকে মনের চোখ কেন যেন আজও খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু কোথাও ওর দেখা মিলে না। প্রায় পাঁচ বছর আগের কথা। এতদিনে হয়তো আরও বড় হয়েছে। নিবেদিতা শাহাজাদাকে এখন দেখলে হয়তো চিনতেও পারবে না। ছেলেটির জন্য ও সবসময় দোয়া করে, ও যেন ভালো মানুষের হাতে পরে, মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। কী জানি ছেলেটি, এখন কোথায় আছে, কেমন আছে ? কিন্তু সেই ছোট্ট ছেলেটির অসহায় মুখের অভোয়ব আজও ওর মনে মনিকোঠায় দখল নিয়ে রেখেছে। চোখের সামনে ছোট্ট শিশুটির চেহারা ভাসমান কচুরীপানার মতো কেবলই ভাসতে থাকে।
সমাপ্ত
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন